দেখে নিন বিএনপির মনোনয়নের শেষ মুহূর্তের হিসাব-নিকাশ

৩০০ আসনে দলীয় প্রার্থী নির্বাচন করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে বিএনপি। প্রায় সাড়ে ৪ হাজার প্রার্থীর সাক্ষাৎকারের প্রথম দিন রবিবার মধ্যরাত পর্যন্ত গড়িয়েছে। গতকালও ছিল একই অবস্থা। আজ ও কাল সাক্ষাৎকার নেওয়া হবে।এরই মধ্যে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ২০-দলীয় জোটের শরিক দলের লম্বা তালিকাও তৈরি হয়েছে। আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির হাতে না দেওয়া হলেও তারা প্রার্থিতা সম্পর্কে বিএনপিকে আকারে ইঙ্গিতে জানান দিচ্ছে। জোট-ফ্রন্টের ‘অপ্রত্যাশিত’ চাওয়ায় বিব্রত বিএনপি।তবে ফ্রন্ট ও জোটকে সর্বোচ্চ ৬০ থেকে ৭০টি আসনে ছাড় দেওয়ার চিন্তাভাবনা করছে বিএনপির নীতিনির্ধারক পর্যায়। আপাতত দলটি কাউকে নিরাশ করছে না। সব দলকেই নিজেদের মতো করে প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করতে বলা হয়েছে। বৃহস্পতিবার জোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে বৈঠক করে প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করতে পারে বিএনপি। তবে তা এখনই প্রকাশ করবে না বলে জানা গেছে।জানা যায়, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম শরিক গণফোরাম এরই মধ্যে ১৫০ আসনে দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে। আরেক শরিক জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি ১৩২ আসনে প্রার্থী বাছাই করেছে। ৩৫ আসনে প্রার্থী তালিকা প্রস্তুত করেছে নাগরিক ঐক্য। এ তালিকা নিয়ে দলটি বিএনপির সঙ্গে দরকষাকষি করবে।

একইভাবে জেএসডি ও বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ টাঙ্গাইলে দুটিসহ বিএনপির কাছে ১০টি আসন চাইতে পারে বলে জানা গেছে।এদিকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটের শরিকরা চায় অন্তত ১৫০ আসন। সম্প্রতি বিএনপির কাছে জামায়াতে ইসলামীসহ ২০-দলীয় জোটের শরিক দলগুলো তালিকা পাঠিয়েছে। তাতেও প্রার্থীর সংখ্যা প্রায় ১০০। সূত্রে জানা যায়, ২০-দলীয় জোটের অন্যতম শরিক জামায়াতে ইসলামী চায় অন্তত ৫০ আসন।এরই মধ্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও জোটের সমন্বয়ক নজরুল ইসলাম খানের কাছে একটি তালিকা পাঠিয়েছে জামায়াত। নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন বাতিল হওয়া এ দলটি ধানের শীষ প্রতীক নয়, স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিএনপি তাদের জন্য সর্বোচ্চ ২০ থেকে ২৫টি আসন ছাড় দিতে পারে বলে জানা গেছে।২০ দলের শরিক দল লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি-এলডিপি ৩০টি আসন চায় বিএনপির কাছে। এ ক্ষেত্রে এলডিপি চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ, মহাসচিব ড. রেদোয়ান আহমেদ, সিনিয়র যুগ্মমহাসচিব শাহাদাত হোসেন সেলিমসহ সর্বোচ্চ ১২ জনের অগ্রাধিকারভিত্তিক আরেকটি সংশোধিত তালিকা বিএনপিকে দেওয়া হয়েছে।

কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীরপ্রতীক ১৬ জনের একটি তালিকা বিএনপিকে পাঠিয়েছেন। তবে চট্টগ্রাম-৫ আসনে (হাটহাজারী) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিমসহ ৪টি আসনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) ৪টি আসনের তালিকা দিয়েছে। অগ্রাধিকার দিয়েছে ১টি।জানা যায়, খেলাফত মজলিশ চারজনকে অগ্রাধিকার দিয়ে একটি তালিকা বিএনপিকে দিয়েছে। এর মধ্যে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে ২টি আসন। জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর) চায় ১৬ আসন। অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে ১টি। জোটের অনিবন্ধিত শরিক দল ডেমোক্রেটিক লীগ (ডিএল) চায় ২টি আসন। এর মধ্যে সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক সাইফুদ্দিন মণি ময়মনসিংহ-৮ (ঈশ্বরগঞ্জ) ও তার দলের আরেক নেতা আবদুন নূর সিরাজগঞ্জ-৫ আসনে নির্বাচন করতে চান। এ ছাড়া মুসলিম লীগ সভাপতি কামরুজ্জামান খান খসরু কিশোরগঞ্জ-৫ আসনসহ আরও ১টি আসন দাবি করেছে বিএনপির কাছে।জানা যায়, সর্বশেষ বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে জোট ও ফ্রন্টের আসন নিয়ে আলোচনা হয়। একইসঙ্গে স্থায়ী কমিটির সদস্যরা যার যার আসনে নির্বাচন করার নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়। ওইসব আসনে জোট বা ফ্রন্টের কোনো প্রার্থী থাকবে না বলে জানা গেছে। বৈঠকে স্থায়ী কমিটি জোটকে ৬০টি আসন দিতে একমত হয়। তবে দরকষাকষিতে সর্বোচ্চ ৭০টি আসন ছাড় দেওয়া হতে পারে জোট ও ফ্রন্টকে।

দল, জোট ও ফ্রন্টের প্রার্থী চূড়ান্ত করতে দিতে গিয়ে কোনো সমস্যা হচ্ছে কিনা— প্রশ্ন করা হলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘আমাদের প্রার্থিতা নিয়ে কোনো কোন্দল নেই। আমাদের দল ও জোট-ফ্রন্টের প্রার্থীরা এখন ঐক্যবদ্ধ। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি ও গণতন্ত্রের স্বার্থে আমরা সবাই যে কোনো ত্যাগ স্বীকার করতে পারি। যিনি মনোনয়ন পাবেন তার পক্ষেই সবাই কাজ করবেন। কারণ এ নির্বাচনটাকে আমরা চূড়ান্ত আন্দোলনের অংশ হিসেবে নিয়েছি। এ নির্বাচনের বিজয়ের ওপর নির্ভর করছে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ।’২০-দলীয় জোটের শরিক দল কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীরপ্রতীক বলেন, ‘আমাদের দলের সব প্রার্থীই ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন কমিশনের মনোনয়ন সংগ্রহ করবেন। পরে মনোনয়ন যাচাই-বাছাই করে একজনের হাতে ধানের শীষের প্রতীক তুলে দেওয়া হবে। জোট ও ফ্রন্টের তালিকা চূড়ান্ত করতে আরও কিছুদিন লাগবে।’নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘আমরা দলীয়ভাবে ৩৫ জনের একটি তালিকা তৈরি করেছি। এগুলো নিয়ে বিএনপিসহ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতাদের সঙ্গে বসা হবে। তবে গণতন্ত্রের মুক্তির স্বার্থে আমরা যে কোনো ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত।’

গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী বলেন, ‘আমরা দেড় শ প্রার্থীর সাক্ষাৎকার নিয়েছি। এখনো এ বিষয়ে ফ্রন্টের বৈঠক হয়নি। সেখানে আমরা কত আসন চাইব তা তুলে ধরা হবে। তবে কোনো আসনে যোগ্য প্রার্থী যে দলের থাকবে তাকেই মনোনয়ন দেওয়া হবে। ফ্রন্টের যোগ্য প্রার্থী থাকলে বিএনপি ১০০ আসনও ছেড়ে দিতে পারে।’এদিকে একটি আসনে একাধিক প্রার্থীকে প্রাথমিক মনোনয়ন দেওয়া হলে পরে চূড়ান্তভাবে একক প্রার্থী কীভাবে নির্ধারণ হবে এবং জোটের প্রার্থীর প্রতীক কীভাবে নির্ধারণ হবে তা বুঝতে নির্বাচন কমিশনে চিঠি দিয়েছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। নির্বাচন কমিশন সচিব বরাবর পাঠানো ওই চিঠি গতকাল পৌঁছে দেওয়ার পর বিএনপির উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য বিজনকান্তি সরকার বলেন, ‘আমাদের জোটগত প্রতীক ব্যবহার ও প্রার্থী মনোনয়ন প্রক্রিয়া নিয়ে কিছু বিষয় স্পষ্ট করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।’সেইসঙ্গে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পদত্যাগ করতে হবে কিনা— তা জানতে চেয়ে আলাদা একটি চিঠি দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*